কুষ্ঠ দূরীকরণ দিবস

কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী জানুয়ারি মাসের শেষ রবিবার কুষ্ঠ দূরীকরণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এবছর তাই জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। আমরা জানি,ভারতবর্ষে কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে মহাত্মা গান্ধী অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ৩০ শে জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর তিরোধান দিবস। কুষ্ঠ রোগীকে যে সমাজে অবহেলিত, অবাঞ্ছিত, উপেক্ষিত করে রাখতে পারে না তা প্রথম শিখিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী তাই তাঁর তিরোধান দিবসে ভারত বর্ষ প্রতিবছর কুষ্ঠ দূরীকরণ দিবস হিসেবে পালন করে।

           আমরা জানি কুষ্ঠ বা লেপ্রোসি একটি অবহেলিত, সংক্রামক,অঞ্চলভিত্তিক রোগ।দীর্ঘদিন যাবত এই রোগের কারণ না জানায় এবং ভয়াবহতার জন্য মানুষের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার ও অজ্ঞতা বিরাজমান ছিল।এই রোগের উৎস হিসেবে ভারতবর্ষকে চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায় যে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল।ইউরোপে দ্রুত সংক্রমনের পর জানা যায় এটি একটি জীবাণু বাহিত রোগ এবং একজন থেকে অন্যজনে এটি সংক্রামিত হয়। দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী মানুষ এই রোগে অধিক আক্রান্ত হয়।দারিদ্র, অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস, প্রচুর আলো বাতাসের অভাব ইত্যাদি এই রোগ সংক্রমণের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

         এই দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো কুষ্ঠ সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করা। জনবিচ্ছিন্ন কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজে পুনরায় গ্রহণ, সব রকম কুষ্ঠ রোগ জনিত কুসংস্কার দূরীকরণ, এই সকল লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে জনসাধারণ এবং কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য ও শিক্ষা প্রদান করাই হচ্ছে এই দিবস পালনের লক্ষ্য।

    সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক কুষ্ঠ রোগ বিরোধী সংগঠন সমূহের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন “আইলেপ” যা তেরোটি আন্তর্জাতিক এনজিওর সমন্বয়ে গঠিত, এই দিবসটি পালনে উদ্যোগ নেয়।

    আইলেপ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রাউল ফোলেরো বিশ্বব্যাপী কুষ্ঠ রোগ বিষয়ক ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি কল্পে এবং কুষ্ঠ রোগের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ১৯৫৪সালে দিবসটি উদযাপনের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগ কুষ্ঠ রোগ।মানব সভ্যতার বিকাশ ও সামাজিক উন্নতির সাথে সাথে উন্নত দেশগুলোতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসলে এখনও নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

        আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো এই রোগ পুরোপুরি নির্মল হয়নি। বর্তমানে ভারত, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি ছাড়াও ব্রাজিল, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো ও তানজানিয়ায় কুষ্ঠ রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিরা শনাক্ত হচ্ছে।

 এই জীবাণুর দীর্ঘদিন মাটিতে বেঁচে থাকার ক্ষমতা থাকায় এবং ভারতের কিছু অংশে উচ্চহারে সংক্রমনের জন্য ভারত বর্ষ এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। এছাড়া সংক্রামক ব্যাধির ইমার্জিং এবং রি ইমার্জিং রোগ তত্ত্বের ধারণের কারণে দেশের কিছু কিছু অংশে এই রোগের বছরব্যাপী অধিকহারে সংক্রমণ পরিলক্ষিত হয়। এই অধিকসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন কর্মসূচি যুগোপযোগী চিকিৎসার দ্বারা নতুন করে সংক্রমণের হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর কুষ্ঠ দূরীকরণ কর্মসূচির আওতায় ২০০২ সালে যখন এমডিটি -“মাল্টিড্রাগ থেরাপি” শুরু হয় তখন থেকেই কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব বা ব্যাপকতা কমতে থাকে। সেই সময় প্রতি দশ হাজারে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা যেখানে ৫৭.৬০জন ছিল সেটাই ২০১৬ সালে ০.৬৬ জনে নেমে এসেছে।

     নিয়মিত বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়া সত্ত্বেও এবং সম্পূর্ণ নিরাময় যোগ্য হওয়া সত্বেও এখনো রোগটি একটি বিরাট জন- স্বাস্থ্য সমস্যা রূপে রয়ে গেছে।

    ১৮৮৩ সালে নরওয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডক্টর আরমার হ্যানসেন কুষ্ঠ রোগের জীবাণু “মাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপরি” আবিষ্কার করেন এই আবিষ্কারের ফলে প্রমাণিত হয় যে কুষ্ঠ একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ, জন্মগত, বংশগত বা অভিশাপ এর ফল নয়।হাজার হাজার বছর ধরে কুষ্ঠ রোগ ও কুষ্ঠ রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিগণকে অভিশপ্ত এবং অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হতো এবং অনেককেই দ্বীপান্তরিত, বনবাস এবং গৃহচ্যুত করা হতো।

   এই রোগের আরেকটি বড় ভয়াবহতা হচ্ছে সময়মতো চিকিৎসা না করলে পঙ্গুত্ব অবধারিত(type 2 deformity) যার ফলে রোগী সারা জীবনের জন্য এই রোগ বহন করেন এবং এর ভয়াবহতা আরও মারাত্মক। তাই সার্বিকভাবে সময়মতো সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সাথে রোগীকে যুক্ত করতে না পারলে এই রোগ আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে। রোগীর শারীরিক সমস্যার চেয়ে ও মানসিক সমস্যা ও সামাজিক সমস্যা এবং বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

       দেশব্যাপী সচেতনতা ও জোরদার ধারাবাহিক নির্মূল কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারি “0” লেপ্রোসি। আমাদের সঠিক ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও সম্পৃক্তকরণ সময়োপযোগী চিকিৎসা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধী জীবনযাপনের মাধ্যমে আমরা অবশ্যই নির্মূল করতে পারি লেপ্রোসির এই ভয়াবহতাকে। আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে তথা বিশ্বকে কুষ্ঠ রোগ মুক্ত করি| যেখানে থাকবে না কোন বৈষম্য, অবহেলা ও পঙ্গুত্বের দুর্বিষহ জীবন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s